পুরুষের তুলনায় মহিলা ঢাকিদের চাহিদা এখন শীর্ষে
আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে যাচ্ছে অবিরাম। মাঠে, প্রান্তরে সবুজ ঘাসের মাঝে মাথা উঁচু করে আন্দোলিত হচ্ছে সাদা কাশের গুচ্ছ। মা দুর্গার বাপের বাড়ি আসার শুভক্ষণ আগতপ্রায়। আর তাঁর সেই আগমনবার্তা ইতিমধ্যেই ধ্বনিত হচ্ছে আকাশে বাতাসে। শরতের নীল আকাশের পটভূমিকায় সাদা কাশের দোলায় নেচে উঠছে বাঙালির প্রাণ-মন। তাদের জীবনে যেন খুশির জোয়ার। পুজো আসছে। দুর্গাপুজো মানেই বাঁধনহারা প্রাণ। দুর্গাপুজো মানেই মনমাতানো খুশির জোয়ার। দুর্গাপুজো মানেই টাক-ডুমা-ডুম ঢাকের বাজনা। দুর্গাপুজো মানেই ধুনুচি নাচের তাল। সেই ঢাকের বাজনা আর ধুনুচি নাচের তালে আমাদের জীবনে ওঠে খুশির হিল্লোল।
আনন্দের সেই আয়োজনে এতদিন পুরুষতন্ত্রের ছোঁয়া ছিল। কিন্তু যুগ বদলের সঙ্গে মানসিকতাও তো পাল্টানো দরকার। তাই ঢাকের বাজনায় পুরুষদের একচেটিয়া অধিকারটাও ভেঙে দেওয়ার সময় এসেছে। আশার কথা এই যে প্রথা ভাঙার প্রচলনটা এক্ষেত্রে শুরু করেছেন একজন পুরুষই। নারী পুরুষের চিরাচরিত দ্বন্দ্বে আবারও এগিয়ে গেলেন মহিলারা। ঢাকের তালে কোমর দুলিয়ে, তাঁদের চাহিদা এখন সবচেয়ে বেশী।পাড়া পাড়ায় পুজো, জন্মদিন, অন্নপ্রাশন, কিংম্বা রাজনৈতিক দলের প্রচার অথবা সরকারি প্রকল্পে সচেতনতা মূলক প্রচার... সর্বত্র এখন মহিলা ঢাকি দলের চাহিদা তুঙ্গে।
সেই কথা খুব সহজভাবেই জানাচ্ছেন মহিলা ঢাকি দলের সদস্যারা। আর হার মানা হার গলায় একপ্রকার পরে নিয়েই পুরুষ ঢাকিরা সেই কথা স্বীকারও করে নিচ্ছেন। লোকশিল্পের পীঠস্থান বলে খ্যাত কল্যাণগড়ের নট্টপাড়ার শিল্পীরা। দিল্লি এশিয়াডে যোগদানকারী এই পাড়ার অধিবাসী একই পরিবারের তিনজন। এও এক নজিরই বলা যায়। এই পরিবারেরই উচ্চ শিক্ষিত সজল নন্দী। পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য তাঁর পিতা স্বর্গীয় অমূল্য চন্দ্র নন্দীর নামে তৈরি করেছেন লোকশল্পীদের নানারকম তালিম দেওয়ার জন্য একটি সাংস্কৃতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সানাই, বাঁশি, ঢাক, ঢোল-সহ অন্যান্য শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গেই ঢাক তৈরীরও প্রশিক্ষণ দেন সজল নন্দী।
হাবড়া, অশোকনগর সহ দূর দূরান্তের বহু পুরুষ ও মহিলারা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তালিম নিয়ে আজ প্রতিষ্ঠিত। এরকমই প্রায় ৫০ জন মহিলা ঢাকি শিল্পী ঢাক বাজিয়ে এলাকার নাম উজ্জ্বল করেছেন। এক সময় বর্ষার পর পর কর্মহারা কৃষি শ্রমিকরা পুজোর সময় ছেলে বা ভাইয়ের হাত ধরে গ্রাম ছাড়তেন। কাঁধে ঢাক ও পুটুলি নিয়ে শিয়ালদহ কিম্বা বড় শহরের বাজারে বা বাস স্টান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতেন পঞ্চমী কিংম্বা ষষ্ঠীর দিন থেকে। গায়ে মলিন জামা, ছেঁড়া চাদরে মোড়া ঢাকির আজও দেখা মেলে।
কিন্তুু মহিলা ঢাকির দল পেতে তিন মাস আগে বুকিং করতে হয় বর্তমান সময়ে। করোনা প্রকোপে এ বছর মহিলা ঢাকি দলের চাহিদা চলে গিয়েছিল তলানিতে। পূজার এক মাস আগেও কোনও বুকিং নেই। ঘরের মানুষ বেকার, পূজার আনন্দটাই মাটি হতে বসেছিল মহিলা ঢাকি দলের। কিন্তু রাজ্য সরকার পূজা কমিটি গুলিকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার ঘোষণার পরেই পরিস্থিতির পরিবর্তন এসেছে। এখন আবার একটি দু’টি করে বুকিং আসছে। কল্যানগড়ে নট্টপাড়ায় মহিলা ঢাকি দলের রেওয়াজ শুরু হয়েছে। এই ঢাকি দলটি আবার নিজেদের ঢাক নিজেরাই তৈরী করেন।


Post a Comment